স্মৃতির পাতায় স্কুল জীবন

চোখ বন্ধ করলে আজও সেই স্মৃতিগুলো ভাসতে থাকে। একদিন সকালে ঘুমমাখা আর জ্বলজ্বল করা চোখে বাবা হাত ধরে এক অচেনা জায়গায় নিয়ে গিয়ে বলল আজ থেকে এটা তোমার জীবনের একটি অংশ হতে যাচ্ছে। তখন কথাটা শুনে বিরক্ত হলেও বুঝিনি যে কথাটা ভুল নয়।

সেই একটা ইউনিফর্মে কাটিয়ে দিলাম বেশ কয়েকটি বছর। একই সাথে পরিবর্তন হলো আরও কত কিছুরই। প্রতি বছর বন্ধুদের তালিকায় যুক্ত হলো বেশ কতগুলো নতুন নাম, যে শিক্ষকদের দেখে ভয়ে দূরে দূরে থাকা হতো আজ তাদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। ধীরে ধীরে সম্পর্কটা হয়ে উঠেছে আরও গভীর।
অপ্রিয় শিক্ষকরাও আজ প্রিয় শিক্ষকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন নামে ডাকা শিক্ষকগুলোর কথা আজও খুব মনে পড়ে, তাদের বিভিন্ন ধরণের উক্তিগুলো আজ আমিও কাজে লাগাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কগুলো কি আসলেই এমন হয়? জানা নেই আমার।

মনে পড়ে বন্ধুদের সাথে টিফিন ভাগ করে খাওয়ার পর্ব? পাশাপাশি কত খুনসুটি, কার বাসা থেকে কবে কি টিফিন নিয়ে আসবে তার একটা তালিকা করা, বন্ধুদের সাথে একই বেঞ্চে বসতে না পারার আক্ষেপ, এক বন্ধু পড়া পারলে নিজে না পারার মন খারাপের মুহূর্ত, কোন ক্লাসের কোন শাখার ছেলেমেয়েগুলো দেখতে ভালো- সেই নিয়ে বন্ধুদের সাথে একটা আলোচনার পর্ব চলতেই থাকত, কোনো ট্রেনিং সেশন করতে হলে বন্ধু না করলে নিজে না করার বিরোধিতা নিজের সাথে,ক্লাস শেষের সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও মামা ঘন্টা দিতে ভুলে গেলে নিজেই সেই দায়িত্বটা পালন করে আলাদা আনন্দ নেয়া, একসাথে স্কুলে আসব বলে বন্ধুদের জন্য রাস্তায় অপেক্ষা, স্কুল ছুটি হলেও রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘুরতে যাওয়ার স্মৃতি, ক্লাস ফাঁকি দিতে গিয়ে ধরা খাওয়ার স্মৃতিগুলো আজও স্পষ্ট।

স্কুল থেকে ট্যুরের যাওয়ার জন্য শিক্ষকদের রাজি করানোটা কষ্টসাধ্য মনে হলেও মানিয়ে নেওয়ার সুখ কতগুন তা বলে বোঝানোর নয়। সেই সাথে বাসায় কত আকুতি মিনতি বাবার কাছে, বাবাকে সরাসরি বলার সাহস না পেয়ে চিঠির মাধ্যমে জানানোর স্মৃতিটাও আজ ঝাপসা নয়।

একটা মাঠে কত ছেলে-মেয়ে, সেই মাঠে এক একজনের এক এক রকম দলবদ্ধ খেলা আবার কেউ কেউ সেই মাঠের কোনো পাশ দিয়ে ফাঁকা থাকলে স্কুল থেকে বাসায় পালিয়ে যাওয়ার ধান্দা, সব যেন ঝকঝকে পানির মত স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট লিখা দেখতে পাচ্ছি।

ক্লাসের পড়া না পারলে ক্লাস থেকে বের করে দিলে বাইরের স্বাদটা উপভোগ করা, ক্লাসের মধ্যে শাস্তি দেওয়া কি কখনো ভুলবার হয় নাকি সেটাও জানা নেই।।রেজাল্ট দেওয়ার আগ মুহূর্তেও মনে হতো আমি অকৃতকার্য। তবে ভালো রেজাল্ট করলে সবার সামনে প্রশংসার প্রতিটি কথা যেন আজও শুনতে পাই।

শিক্ষকদের দেওয়া কত ঝারি খাওয়া আর মনে মনে আনন্দ নেওয়ার সময়টা যে ফুরিয়ে যাচ্ছে সেটা না বুঝতে পারা আমরা সবাই উল্টো শিক্ষকদের নিয়েই মন্তব্য চালাতে থাকতাম।

কতগুলো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি হিসেব নেই তবে সব থেকে ভালো ছিল বিদায় বছরে ২১শে ফেব্রুয়ারির আয়োজন। ক্লাস থেকে চাঁদা ওঠানো, কিভাবে কি করব সব পরিকল্পনা করা, শিক্ষকদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষকের সাথে সাহস করে কথা বলতে যাওয়া, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, নাটক অনুশীলন করা, রাত জেগে দেয়ালিকা বানানো সবকিছু আজও পরিষ্কার দেখতে পাই চোখ বন্ধ করলে।

কিভাবে করে দশ বছর পার হয়ে গেল চোখের নিমিষেই, বুঝতেই পারলাম না। ঠিক দশটা বছর পর সেই চোখের পানি নিয়ে বিদায় নেওয়ার পালা চলে এলো। বিদায়ের আগের দিন পর্যন্ত কত প্রস্তুতি কিন্তু বিদায়ের বেলায় সব যেন ধুলোয় মিশে গেল। কি বলতে কি বলে ফেলছি নিজের অজান্তেই। সেই নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন আঙিনা সবকিছু কতটাই না আপন হয়ে গিয়েছিল! তাদের ছেড়ে চলে আসাটা তখন একটুও সুখের মনে হচ্ছিল না, থেকে যাওয়ার একটা পিছুটান অনুভব করছিলাম। সবার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে গিয়েও গুলিয়ে ফেলছিলাম সেইদিন, সেই কঠিন মনের মানুষটির চোখও সেইদিন ছিল ভেজা।কতশত ইচ্ছেগুলো মনে হচ্ছিল আজও যেন অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে। পূরণ করার আরও কিছু সময় প্রয়োজন কিন্তু আজ যে সময় শেষ!

যে গেট দিয়ে বের হয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য সারাক্ষণ সময় গুনতাম আজ সেই গেট দিয়ে বেরিয়ে আসতে যেন কোনোভাবেই ইচ্ছে করছে না, আজ সেই প্রাঙ্গণের সবকিছু আঁকড়ে ধরে আছে মনে হচ্ছে, যেতে না দেওয়ার কত প্রচেষ্টা কিন্তু কিছুই যেন কাজে লাগছে না। শত শত, হাজার হাজার স্মৃতি নিয়ে এক পা দু’পা করে বাড়ি আসার মধ্য দিয়ে শেষ হলো স্কুল জীবন।

Related Posts

23 Comments

Leave a Reply